দাও ফিরিয়ে বায়তুল মুক্কাদিস

দাও ফিরিয়ে বায়তুল মুক্কাদিস

চোখে আর জল আসে না।শুধুই রক্ত ঝরে।মাটির শরীর চূর হয়।বয়ে যায় রক্তের প্লাবন। নেকড়েদের হানায় বিধ্বস্ত গাঁজা, ফিলিস্তিন। অবুঝ নিষ্পাপ শিশুরা যারা যুদ্ধের মানে বোঝে না,বিমান থেকে পতিত বোমায় তারা নিষ্পেষিত।গাঁজার আকাশ, বাতাস কাঁপছে। দালান-কোঠা বিধ্বস্ত। আহতদের আর্তনাদে গাঁজার আকাশ ভারি হয়ে উঠেছে। খাদ্য,পানি ও চিকিত্সার অভাব। হাসপাতালেও আক্রমণ। বিদ্যুত্ ব্যবস্থার চরম অবনতি।বাতাসে মৃত মানুষের গন্ধ মিশে গেছে।লাশ কবরস্থ করা দুরূহ। বোমার আঘাতে মুসলমানের বুক ঝাঁঝরা হচ্ছে। ওদিকে পাহাড় চূড়ায় ইহুদিরা আসন পেতে বসে আছে। মুসলিম হত্যা যজ্ঞ নিরিক্ষণ করছে। বায়নোকুলার দিয়ে দেখে চলেছে এ বিভৎস কান্ড।এটাই কি মানবতা? ওই নেতানিয়াহু,ডোনাল্ড ট্রাম্প দখলদারির পাশবিক নেতা আর কতদিন চালাবে এ দখলদারি নিধন কাজ? বিশ্ববিবেক, বিশ্বমানবতা কবে জাগবে?

মুসলিম জাহানের পাখির চোখ মসজিদুল আকসা। মুসলমানদের প্রথম কেবলা। এটা জেরুজালেম বা বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থিত। এর পূর্বে মৃত সাগর পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর। মসজিদুল আকসা জেরুজালেমের পুরনো শহরে অবস্থিত। একই প্রাঙ্গণে কুব্বাত আসা সাখরা,কুব্বাত আস সিল সিলা ও কুব্বাত আন নবী নামক স্থাপনাগুলি অবস্থিত।স্থাপনাগুলোসহ এই পুরো স্থানটিকে হারাম আল শরিফ বলা হয় ।

মুসলিম এর কাছে মসজিদুল আকসা কেন প্রাণ প্রিয়?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে,হযরত ইয়াকুব (আঃ) বায়তুল মুক্কাদিস এর ভিত্তি স্থাপন করেন। আলকুদস বা বায়তুল মুক্কাদিস শব্দটি হিব্রু বায়তি হাম্মিকদাশ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ। প্রথম দিকে এটি সুলায়মান (আঃ) কতৃক নির্মিত মসজিদ বোঝাত আসলে এ সময়ে মসজিদটি পুনর্নির্মিত হয়। মহাবীর হেরোদ এর রাজত্বকালে মসজিদ ই সুলায়মানী পুনর্নির্মিত হয়। (Herod The Great 37-4B.c )। এর পর বিভিন্ন সময়ে ভাঙা গড়ার কাজ চলে, রদবদল ও হয়। ৩২৪ খ্রিষ্টাব্দে কনসটানটাইন খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহন করলে এখানে গির্জা, খানকা ও সরাইখানা নির্মাণ করেন। এ সময় সব ধর্মের মানুষের চোখের মণি হয়ে ওঠে।

মহানবী রাসূল (সাঃ) ষোলো মাস বায়তুল মুক্কাদিসকে কেন্দ্র করে, এর দিকে ফিরে সলাত আদায় করেন। এর পর আল্লাহর নির্দেশ এলে কাবার দিকে মুখ ফেরান। তখন থেকে মুসলিমরা বায়তুল মুক্কাদিসের দিকে সিজদাহ না দিয়ে কাবাকে কেন্দ্র করে সিজদাহ দেয়। রাসূল (সাঃ) এর মিরাজের ঘটনা বায়তুল মুক্কাদিস এর সাথে সম্পর্কিত। কুরআন শরীফে এর নামকরন করা হয় ‘আল মসজিদুল আকসা ‘। রাসূল (সাঃ) এর নবুওয়াত প্রকাশের একাদশ বৎসরের (৬২০ খ্রিষ্টাব্দে) রজব মাসের ছাব্বিশ তারিখে দিবাগত রাতে কাবাশরীফ থেকে মসজিদুল আকসায় গমন করেন। এখানে সলাত আদায় করেন।এই সময়ে এখানে তাঁর প্রথম পদার্পণ।

কুরআনে বর্ণিত –
“মহান ও পবিত্র সেই সত্তা(আল্লাহ্) যিনি স্বীয় বান্দা(মুহাম্মদ) কে আল মসজিদুল হারাম থেকে আল মসজিদুল আকসা পর্যন্ত নিশি ভ্রমণ করান,যার চতুষ্পাশ্বস্থ এলাকাকে আমি(আল্লাহ্) বরকতময় বানিয়েছি।” (১৭:১)
আলকুরআনের এমন স্বতঃসিদ্ধ বাণীই যথেষ্ট আল মসজিদুল আকসার গুরুত্ব পেতে বিশ্বমানবের বিশ্বমানের জন্য।

রাসূল (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর মুসলিম বাহিনী ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে। ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে আজদায়ন নামক স্থানে মুসলিম বাহিনীর নিকট রোমান বাহিনী পরাজিত হয় (আজদানায়ন নিবন্ধ দ্রঃ), (আল মাসউদী, মরূজু”য যাহাব,পঞ্চম খন্ড)। ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে য়ারমূকের যুদ্ধে জেরুজালেম আরব বিজয়ীর অধিকারে আসে।এ সময় উমর ইবনুল খাত্তাব শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য সন্ধি স্বাক্ষর করেন জেরুজালেমের সম্রাট সফ্রেনিয়াস তাকে স্বাগত জানান।

●১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ক্রুসেডের যুদ্ধে য়ুরোপীয় খৃষ্টান বাহিনী জেরুজালেম দখল করে।
●১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ২রা অক্টো: সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী এখানে বিজয়লাভ করে। ধর্ম আর রাজনীতি মিশে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। ইসরাইলের পায়ের তলার মাটি সরে যায়।
●১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে রাষ্ট্রসংঘের মাধ্যমে ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হয়। ফিলিস্তিনের উপর চলতে থাকে অকথ্য অত্যাচার।
●রাষ্ট্রসেঙ্ঘর প্রস্তাব অনুযায়ী ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে নভেম্বরে সত্তর বছর পূর্তিতে ইসরাইল পুণ প্রতিষ্ঠিত হল। ফিলিস্তিনের দুর্দশা ঘনিয়ে এল। গণতন্ত্র ও মানবধিকার ক্ষুণ্ণ হল।

সম্প্রতি জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেনট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তপ্ত পরিস্থিতির আগুনে ঘি ঢালল। এ সময় স্বাধীনতার স্বীকৃতি পেতে ফিলিস্তিনরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। জেরুজালেম আজ হতাশার জালে আবদ্ধ।তাকে জানতে আমরা ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলিয়ে দেখতে পাই জেরুজালেমের গুরুত্ব। জেরুজালেম পরাধীন! এ যন্ত্রণা মুসলিম দুনিয়ার পাঁজর খান খান করে দেয়।এ পূণ্যভূমি মুসলিম এর প্রাণ। আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ অধিবেশনের বিরল সিদ্ধান্তে মুসলিম উম্মাহ প্রেরণা পেল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ দেশগুলি ফিলিস্তিনকে দিল বাঁচবার আশ্বাস। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করার পর একশো আঠাশটি দেশ প্রস্তাবের বিপক্ষে এবং নয়টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। হতাশ ফিলিস্তিন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ বিসর্জনে স্বাধীনতা চাইল। পাশাপাশি ইসরাইলও নামল প্রতিরোধে। ফিলিস্তিনের মাটি লাল হয়ে উঠল। জোটবদ্ধ সিদ্ধান্তের আশাতেই আজ অসহায় ফিলিস্তিন চাতকের মত চেয়ে রইল স্বাধীনতার বৃষ্টি পেতে। এদিকে তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের বিবাদমান অবস্থাকে নমনীয় করতে  পাকিস্তান,কুয়েত, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, ও মালেশিয়ার মতো মধ্যপন্থী দেশগুলিকে নিয়ে শক্তিশালী বলয় করতে চায়। পৃথিবীর একশো আশি কোটি মুসলিমের হৃদয়ের স্পন্দন আল আকসা। এ স্পন্দনের প্রবাহ কখনও থামবে না।বিশ্ব মুসলিম আজ
জাগ্রত। দিকে দিকে মুসলিম নিধনযজ্ঞ চলছে। লেবানন,সিরিয়া,ইরাক,লিবিয়া,আফগানিস্তান ও মায়ানমার প্রত্যেক জায়গায় নীড় হারা পাখির মত আজ মুসলিমরা।

আজ আমরা মুসলিমরা আওয়াজ  তুলে এগিয়ে আসি- “মুক্ত হোক জেরুজালেম, মুক্ত হোক আল কুদস, মুক্ত হোক আল আকসা,মুক্ত হোক নিপীড়িত বিশ্ব মুসলিমরা।ইহুদি দখলদারি আগ্রাসী নীতি থেকে ফিলিস্তিন ফিরে পাক তার স্বাধীন মাতৃভূমি।”

 

–  সেরিনা বেগম

আপনার মতামত

avatar
  Subscribe  
Notify of