তাৎক্ষনিক তিন তালাক এ তালা

তাৎক্ষনিক তিন তালাক এ তালা

কেন্দ্রের কট্টর ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী বিজেপি সরকারের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার লোকসভায় তাৎক্ষনিক তিন তালাক বিরোধী বিল পাশ হল। এই বিলে তাৎক্ষনিক তিন তালাককে ফৌজদারী অপরাধ গণ্য করে যে পুরুষ তাৎক্ষনিক ‘তিন তালাক’ দেবে তার তিন বছর কারাবাস ও জরিমানার সুপারিশ করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট শুধুমাত্র তাৎক্ষনিক তিন তালাককে বাতিল করেছিল, কিন্তু এই বিলে তালাকে বায়েন সহ পরোক্ষভাবে তালাকের অন্যান্য প্রকারকেও বেআইনি বলা হয়েছে। বলা হয়েছে “অথবা অন্য কোনওভাবে বিচ্ছেদের উদ্দেশ্যে তালাক দেওয়া হলেও…” বেআইনি গণ্য হবে। জানা যাচ্ছে এই বিলে তিন তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী আহকামকে বেআইনি, অচল বলে অভিহিত করা হয়েছে।

এই বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য, তালাক ই বিদা’ঈ সহ তালাকের সমস্ত ‘প্রকার’ই ইসলামী শরিয়াহর অন্তর্ভুক্ত বিষয়। এবং এই বিষয়ে শুধুমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের বিদগ্ধ বিজ্ঞজনেরা, আইন বেত্তারাই শেষ কথা বলার অধিকার রাখেন। কোনো আদালত কোনো পার্লামেন্ট বা কোনো সরকারের এই বিষয়ে কোনো মতপ্রকাশ করার অথবা তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত হঠকারী সিদ্ধান্ত মুসলমানদেরদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার নেই। কেননা এটা একেবারেই অবাঞ্ছিত অনধিকার চর্চা এবং সরাসরি ধর্মে হস্তক্ষেপ করার শামিল। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সহ দেশের সমস্ত মুসলিম সংগঠনই এই বিলের বিরোধিতা করেছে
তারা পরিস্কার জানিয়েছেন তিন তালাক মুসলিম পার্সোনাল ল’-এর অন্তর্গত। এবং তাঁরা আরো বলেছেন, বিল তৈরির সময় কোনো আলেম-উলামাদের সাথে আলোচনা করা হয়নি। তাই এই বিল আসলে শরিয়তি আইনে সরাসরি হস্তক্ষেপ। উপমহাদেশের শীর্ষ ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দও এই বিলের বিরোধিতা করেছে, দেওবন্দের উপাচার্য আবুল কাশেম নোমানী সাহেব মন্তব্য করেছেন “এই বিল আইনে পরিণত হলে মুসলিম মহিলাদের কল্যাণ হবে না।” এবং তিনি আর একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন তিনি বলেছেন, “বিষয়টি এক তালাক কিংবা তিন তালাকের নয়। আইনের চোখে বিবাহ বিচ্ছেদটাই হয়ে যাবে সম্পূর্ণ বাতিল।’

মুসলিম পার্সনাল ল’ বোর্ডের মুখপাত্র মাওলানা সাজ্জাদ নোমানি সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন এবং রাজ্য সভাকে আহবান জানিয়েছেন যেন এ বিল পাশ করা না হয়। তিনি খুব সুন্দর বলেছেন যে, “আইন মন্ত্রণালয় মুসলিম দেশগুলোর দৃষ্টান্ত দিচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো দেশে তা ক্রিমিন্যাল আইনের অন্তর্ভূক্ত নয়। মুসলিম সমাজকে ধ্বংস করার জন্যই এ আইন করা হয়েছে।”

বিলটির প্রতিক্রিয়ায় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বাংলার সম্পাদক মুফতি আব্দুস সালাম সাহেব বলেছেন, এই জায়গায় আইনের কোনো হস্তক্ষেপ আমরা চাই না। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না কেউ একত্রে তিন তালাক দিক। ভুলভাবে তালাক দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে ওলামা ও মুফতিরা এক্ষেত্রে নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশের আইনে যদি বলা হয় তিন তালাক দিলে তা সাব্যস্ত হবে না, তাহলে তা ঠিক হবে না। কারণ এটা শরীয়ার বিষয়। এক্ষেত্রে আমরা কোনো আইন চাই না। ধর্মীয়ভাবে যে জিনিসটা ভুলভাবে চলছে, তাকে আমরা ধর্মীয় পথেই বন্ধ করতে চাই। এটাই আমাদের মত।

মূল কথা, তিন তালাক নিয়ে হিন্দুত্ববাদী ইসলাম বিদ্বেষী আর তাদের দালালেরা যে ভঙ্গিতে মুসলিম মহিলাদের প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করছে, দু চারজন পতিতা মাইন্ডের নামধারী মুসলিম মহিলা ছাড়া তামাম মুসলিম নারী সমাজ ওদের এই ‘উদ্বেগ’ ‘সহনাভুতি’কে ইসলাম এবং মুসলমানদের উপর হামলা বলেই মনে করছে। দেশের তামাম মুসলিম মেয়েরা এটা ভালোভাবেই বোঝেন যে, আসলে ইসলাম বিদ্বেষীদের মুসলিম মেয়েদের প্রতি এই যে এতো দরদ উথলে উঠছে এটা সহনাভুতি-সঞ্জাত মোটেই নয়, আদতে এটা হচ্ছে ইসলাম এবং তামাম মুসলিম নারী পুরুষদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অভিযান। তাই ওরা আইন করে ‘তালাক’ বন্ধ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। অথচ ওই পাপদগ্ধ মুখেই ওরা দিনরাত ব্যাক্তি স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র তথা মৌলিক মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতে লজ্জাবোধ করেনা।

শেষ কথা, ভারতীয় সংবিধানের একাধিক ধারায় সংখ্যালঘুদের ধর্ম, বর্ণ, লিপি, সংস্কৃতি রক্ষার স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার রুপে চিহ্নিত করা হয়েছে।মুসলিম পার্সোনাল ‘ল ইসলামী রীতিনীতি বা সংস্কৃতিরই অঙ্গ। এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ গুরুতর অন্যায় অমার্জনীয় অপরাধ। সেহেতু দু একটি কুলাঙ্গার নামধারী মুসলমান ছাড়া আমাদের তামাম ভারতীয় মুসলিম পুরুষ এবং মহিলাদের এটাই বক্তব্য যে আমাদের ধর্মীয় আইনে কোনপ্রকার হস্তক্ষেপ আমরা কোনোমতেই বরদাস্ত করবো না। এবং এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাব, ইনশাল্লাহ।

 

আরমিন খাতুন

আপনার মতামত

avatar
  Subscribe  
Notify of