নিরপেক্ষ ইতিহাসে অযোধ্যা

নিরপেক্ষ ইতিহাসে অযোধ্যা

নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের মতে ‘ষোড়শ শতকের আগে অযোধ্যা শহরটি ছিল ঠিক আর পাঁচটা শহরের মতো, তার না ছিল কোনো বিশেষত্ব, না কোনো গৌরব। রাম জন্মভূমির যে দাবী নিয়ে এত হইচই, সেই বাবরি মসজিদ যখন ১৫২৮-২৯ সালে তৈরী হয় তার হাজার বছর পূর্বেও রামের কোনো মন্দির ওই জায়গায় আদৌ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি এ সম্পর্কে কোনও আনুমানিক ভিত্তিও নেই।

বাবরী মসজিদ যে রামের জন্মভূমিতে তৈরী হয়েছে, এই গল্প চালু হয় অষ্টাদশ শতকের শেষে, আর রামের মন্দির ভেঙে বাবরি মসজিদ তৈরী হওয়ার গল্পটি আরও পরের, উনবিংশ শতকে। অর্থাৎ রামের জন্মের স্থান হিসেবে কোনও জায়গাকে নির্দিষ্ট করা একেবারেই অসম্ভব। এই রায়টি ১৯৯২ সালের পরবর্তী ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের ফল এবং এই রায় দিয়েছিলেন কয়েকজন যশস্বী ঐতিহাসিক। যাঁদের মধ্যে আছেন রামশরণ শর্মা, এম আতাহার আলী, ডি এন ঝা, সুরজ ভান প্রমূখ বিখ্যাত বিখ্যাত ঐতিহাসিকেরা।

কিন্তু এই রায় প্রদানের ফলে এদের অনেককেই হিন্দুত্ববাদীদের হাতে চরম লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল। এমনকি আর এস এস, বিজেপির নেতারা এখন এই বিখ্যাত ঐতিহাসিকদের ইতিহাস লেখার অধিকার নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন, তাই রামশরণ শর্মা, রোমিলা থাপারের মতো পৃথিবী বিখ্যাত ঐতিহাসিকদের লেখাকে আর এস এসের হুমকিতে এবং বিজেপি নেতাদের নির্দেশে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এবং তাঁদের বদলে নতুন ইতিহাস রচনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসার্চ ট্রেনিং’-এর ভারপ্রাপ্ত গবেষকদের। যতটুকু জানা যায় এরা একেবারেই নামগোত্রহীন নন, কিন্তু এদের নাম কোনোদিন ইতিহাস গবেষণার জগতে শোনা না গেলেও আর এস এস, বিজেপির অন্দরমহলে এরা অতি পরিচিত এবং তাদের ‘খাস লোক’ অধিকাংশই আর এস এস এবং বিজেপির সদস্য। তারাই ভারতের ইতিহাসকে হিন্দুত্ববাদের মোড়কে উপাস্থাপনের দায়িত্ব পেয়েছেন।

যাই হোক… শুধু উপরোক্ত উল্লেখিত ঐতিহাসিকরাই নন জাতীয় অধ্যাপক আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ও এই সম্পর্কে প্রচুর গবেষণার পর রায় দিয়েছিলেন যে, “রামায়ণ আগাগোড়া কাল্পনিক।” প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সুরুজ ভানের মতে, ‘এ.এস.আই-এর জরিপ রিপোর্টে একথা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাবরী মসজিদের জায়গায় রামমন্দির কেন কোনো মন্দিরের অস্তিত্ব কোনোকালেই ছিল না’। প্রখ্যাত সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতে, “রামায়ণ পুরোপুরি একটা কাল্পনিক কাহিনী।” নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আর. এস. শর্মা তাঁর ‘কমিউনাল হিস্টরি এ্যান্ড রামস অযোধ্যা’ [Communal History and Rams Ajodhya] গ্রন্থে বলেছেন, ‘সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে এভাবে জ্বলন্ত মিথ্যাকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। বাবর রামমন্দির ধ্বংস করেছিলেন এবং সে স্থানে তিনি বাবরী মসজিদ স্থাপন করেছিলেন, এ ধারণা যতখানি মিথ্যা ততখানিই ঘৃণ্য হিন্দুত্ববাদীদের এই দুরভিসন্ধিমূলক প্রচার’।

সবচেয়ে সুন্দর বলেছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং কলামিষ্ট গৌতম রায়, তিনি লিখেছিলেন “আর এস এস, বিজেপির কল্পনার রামের একমাত্র কাজ বিধর্মীর উপাসনা গৃহ ধ্বংস করা।” তাই পঁচিশ বছর আগে রামভক্ত হিন্দু সন্ত্রাসীরা পরম ধর্মীয় পুণ্যের কাজ মনে প্রকাশ্যে দিবালোকে জয় শ্রী রাম স্লোগান দিতে দিতে বাবরী মসজিদ ধ্বংস করেছিল। এটাই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে আমাদের ভারতবর্ষের তফাত। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসীরা পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে অতি সংগোপনে নাশকতা মূলক কর্মকান্ড ঘটায় এবং হত্যা করে নিরীহ মানুষ। কিন্তু আমাদের দেশে হিন্দু সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটাতে কোনো গোপনীয়তার প্রয়োজন হয় না। তারা সন্ত্রাস ঘটায় প্রকাশ্যে সবার সামনে এবং পুলিশ প্রশাসনের মদতে, সন্ত্রাস হয় দিন-দুপুরে এবং উৎসবের পরিবেশে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসীরা সাধারণত মুহূর্তের মধ্যে সন্ত্রাস ঘটায় এবং দ্রুত পুলিশের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। কিন্তু বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজটি মুহূর্তে শেষ হয়নি, পুলিশের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টাও হয়নি।বরং চলেছে অতি নির্ভয়ে এবং সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি। বাবরি মসজিদ যখন ধ্বংস করা হয় তখন সে দৃশ্যটি টিভি যোগে সারা বিশ্ববাসী দেখেছে। মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে বা টিভির সামনে বসে সে দৃশ্য তৃপ্তিভরে উপভোগ করেছে দেশের হাজার হাজার পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আদালতের বিচারক, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও মিডিয়া কর্মী। দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও অতি শান্ত মনে সে চিত্র টিভিতে দেখেছেন। দেখেছেন তার সরকারের অন্যান্য মন্ত্রী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও। কোন ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন তারা বোধ করেননি। পুলিশ সে অপরাধ রোধে লাঠিচার্জ করেছে বা উঁচু গলায় কাউকে নিষেধ করেছে- সে প্রমাণ নেই। সে অপরাধে কোন হিন্দু সন্ত্রাসী গ্রেফতার হয়েছে বা তার শাস্তি হয়েছে- সে প্রমাণও নেই। প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে সেদিন যেমন কোনই কার্যকর প্রতিরোধ ওঠেনি, কোন নিষেধাজ্ঞাও শোনানো হয়নি। তৎকালীন উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে হিন্দু সন্ত্রাসীরা বাবরি মসজিদ শহীদ করে দেয়।

হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসের এরকমই এক উৎসব হয়েছিল অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় এবং সেটি ভারতে যেমন প্রথম নয়, শেষবারও নয়। অতীতেও এমন প্রকাশ্যে, উৎসবের পরিবেশে সন্ত্রাসমূলক কর্মকান্ড হিন্দু সন্ত্রাসবাদীরা ভারতে অসংখ্যবার ঘটিয়েছে এবং বর্তমানেও ঘটাচ্ছে দেশের নানান প্রান্তে।…

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পঁচিশ বছর পার হয়ে গেল, এই দীর্ঘদিন যাবৎ বিচারের নামে প্রহসন চলছে, একজন অপরাধীরও কিঞ্চিৎ পরিমাণ শাস্তিও হয়নি। বরং এই ঘৃণ্য অপরাধ ঘটানোর প্রতিদান স্বরুপ তাদের নানান ভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের বসানো হয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ন পদে। দেশের প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ থেকে দেশের অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদ সবই কলুষিত হয়েছে এই সন্ত্রাসীদের নাপাক ছোঁয়ায়। এবং এই সন্ত্রাসীদের মদতে আর এস এস, বিজেপির সন্ত্রাসীরা সমগ্র ভারতে যে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে রাষ্টীয় মদতে সন্ত্রাসের এরকম নজির বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এর আগে কখনও দেখা যায় নি।

[তথ্য সূত্রঃ ‘রামমন্দির না বাবরী মসজিদ’ পৃঃ ৫৫।; পলিটিক্স অফ বাবরী মসজিদ’, কুলদীপ নায়ার;  ‘এ এক অন্য ইতিহাস’, গোলাম আহমেদ মোর্তাজা।]

 

আরমিন খাতুন

আপনার মতামত

avatar
  Subscribe  
Notify of