গো হত্যা ও ভারতবর্ষ

গো হত্যা ও ভারতবর্ষ

হিন্দু ধর্মগুরুরা গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করেছে সম্রাট অশোকের সময় থেকে। কিন্তু সম্রাট অশোক শুধু গরুর মাংস না সম্রাট অশোক মহিষ, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদির মাংসও খাওয়া যাবে না এই ফরমান জারি করেছিলেন। সম্রাট অশোক একজন বৌদ্ধ ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে বৌদ্ধরা গরু, মোষ, কুকুর, বাঁদর সব ধরনের মাংসই খায়। আরও মজার বিষয়, এক বৌদ্ধ সম্রাটের নির্দেশে হিন্দুরা গরুর মাংস খাওয়া বাদ দিলেও বৌদ্ধরা কিন্তু এখন বেমালুম গরুর মাংস খায়। এটা হিন্দুদের দূর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু না। গরুর মাংস খাওয়া যাবে না এরকম কথা হিন্দু ধর্মের কোথাও বলা নেই। গরুর মাংস খেতে হিন্দু ধর্মে কোনো নিষেধও নেই। অবশ্য অধিকাংশ হিন্দুরাই প্রকাশ্যে গরুর মাংস না খেলেও গোপনে ঠিকই খায়। আবার গরুর মাংস বিদেশে রপ্তানি করে মোটা ডলার রিয়েলও আয় করে সেই অর্থ দিয়েই আবার দেশে গোরক্ষার কার্যক্রম চলে। www.beef.sabhlokcity.com

এই সম্পর্কে মহাত্মা গান্ধী অনেকটা এরকমই বলেছিলেন যে, ভারতের যে ব্যবসায়ীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গরু রপ্তানি করে জুতোর কারখানায় চামড়ার যোগান দেবার উদ্দেশ্যে, তাদের অধিকাংশই তো হিন্দু এবং ধর্ম বিশ্বাসী। তারা নিশ্চয়ই জানে, সেই সব গরু এবং সেই সব জুতোর মাঝখানে একটি ক্রিয়া আছে যার নাম (সমাসবদ্ধ পদ হিসাবে) সংক্ষেপে গোহত্যা। তা, সেটি বন্ধ করা হবে তো? ভারতের গ্রামাঞ্চলে যে বলদের কাঁধে লাঙল এবং গাড়ির জোয়াল তুলে দিয়ে বছরের পর বছর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়, তার নামও তিলে তিলে গোহত্যা নয় কি? এগুলো যদি বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে কেউ যেন আর গোহত্যা নিবারণের প্রস্তাব নিয়ে না এগোন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ঘরে-বাইরে” উপন্যাসের শেষ ভাগে নিখিলেশ-এর মুখ দিয়ে তিনি এই সম্পর্কে যে বয়ানটি তুলে ধরেছিলেন, সেটি কিন্তু যুক্তি হিসাবে অকাট্য। “বুদ্ধতো শুধু তো গরু নয়, সমস্ত পশু বলির বিরুদ্ধেই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দুরা বেছে বেছে তার থেকে শুধু গরুকে রক্ষা করার দায়িত্ব মেনে নিল, আর বাকিদের আগের মতনই মারতে এবং খেতে লাগল—এটাকে কীভাবে এবং কতটা বুদ্ধের শিক্ষা বলে চালানো যায়? বা, আদৌ যায় কি?”

যারা বলেন কৃষি কাজের জন্যই এই গোরক্ষার প্রয়োজন, তাদের এই অসার দাবী খন্ডন করে রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন তুলেছেন : “কৃষিতে শুধু গরু নয়, মোষও কাজে আসে। সেই আদ্যি কাল থেকেই। এবং সারা ভারত জুড়েই। দুধ ঘি পেতে এবং খেতেও উভয়কেই লাগে। অথচ, কৃষির নামে গোহত্যা বন্ধ হল, মোষ বলি বন্ধ হল না—এ কেমন কথা? (ঘরে-বাইরে, পৃঃ ৫৬৮-৬৯)

ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কালে উত্তর ভারতের একদল কট্টরপন্থী হিন্দু নেতা ও কতিপয় উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠন গোহত্যা নিবারণ ও গোরক্ষা সমিতির নাম দিয়ে একটা আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের বক্তব্য গরু নাকি শাস্ত্রে হিন্দুদের মাতা হিসাবে ঘোষিত। মৃত্যুর পর গরুর লেজ ধরেই নাকি স্বর্গ যাওয়ার পথে বৈতরণী নদী পার হতে হবে। অতএব হিন্দুদের গরুর মাংস খাওয়া চলবে না শুধু নয়, অন্যদেরও এই সুপবিত্র গোচারণভূমিতে গোমাংস ভোজন করতে দেওয়া হবে না। তারা সংবিধানে গোহত্যা নিবারণ আইন ঢোকানোরও প্রানপন চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু মহাত্মা গান্ধী সংবিধানে গোহত্যা নিবারণ আইন ঢোকানোর প্রস্তাবের খুব তীব্র ভাষায় বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি হিন্দুদের ধর্ম বিশ্বাসের কারণে অহিন্দু জনসাধারণের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ করার বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল: “ভারতে তো শুধু হিন্দুরাই বাস করে না। এখানে মুসলমান, পার্শি, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও আছে। এই যে একদল হিন্দুর মনে হচ্ছে যে ভারতবর্ষ এখন থেকে শুধু হিন্দুদেরই দেশ এটা ভ্রান্ত ধারণা। . . . সুতরাং আমি বলব, সংবিধান রচনা পরিষদে যেন এটা নিয়ে কেউ চাপাচাপি না করেন।” (গান্ধী-১৯৬৯. ২৭৭-৮০)

তো যাই হোক মূল কথা এটাই যে, আমরা একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বাসিন্দা। ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটার মানে কী? এর সরল মানে হল, রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেবে না। কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাবে না। অথবা কাউকে আলাদা করে বিরোধিতা করবে না। নাগরিকদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পর্যায়ে বিশেষ বিশেষ ধর্মাচরণের অধিকার থাকবে, কিন্তু তা কখনই অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে না। কিন্তু ভারতীয় রাষ্ট্র কি এই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ? মোটেও নয়।

.. যদি উল্লেখিত অর্থে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র অম্লান থাকতো তাহলে শুধুমাত্র গো হত্যার অভিযোগে শত শত মুসলমানকে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের পৈশাচিক হিংসার বলি হতে হতো না। কেউ তার নিজস্ব প্রয়োজনে গরুর মাংস ভক্ষণ করবে তাতে কারো উত্তপ্ত হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। এবং এই অভিযোগে অস্ত্র দিয়ে কারোর মাথা কেটে নেওয়ার বৈধতাও রাষ্ট্র দিতে পারে না। যেটা বর্তমানে দেওয়া হয়েছে।

শেষে স্বামী বিবেকানন্দের একটি মহান উক্তি স্বরণ করে শেষ করছি;-

গো-রক্ষক প্রচারক;- “শাস্ত্র বলে গরু আমাদের মাতা।”
বিবেকানন্দ;- হ্যাঁ, গরু যে আমাদের মা, তা আমি বিলক্ষণ বুঝেছি—তা না হলে এমন সব কৃতি সন্তান আর কে প্রসব করবেন?
(“স্বামী-শিষ্য-সংবাদ”; স্বামীজীর বাণী ও রচনা, ৯ম খণ্ড)

আরমিন খাতুন

আপনার মতামত

avatar
  Subscribe  
Notify of