ভারতবর্ষে মুসলিমদের আগমন

ভারতবর্ষে মুসলিমদের আগমন

ভারতবর্ষে মুসলমান আগমনের ইতিহাসে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা সাধারণত এই শিক্ষাই পায় যে, ভারতে মুসলমানদের আগমন ঘটেছে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সময়। এই সঙ্গে আরও ধারণা… মুসলমানগণ বিদেশি, লুণ্ঠনকারী এবং অত্যাচারী। তাঁরা বিনা কারণ বা প্ররোচনায় ভারত আক্রমণ করেছে। যারা এইসব তথ্য পরিবেশন করেছেন তারা পুরোপুরি বিকৃত তথ্য পরিবেশন করেছেন। আসলে ইংরেজ সৃষ্ট বিকৃত ইংরেজি ইতিহাসের অনুবাদ আর ভাবানুবাদ ভাঙিয়ে চালাতে গিয়ে সিংহভাগ ভারতীয় ঐতিহাসিকেরা এই বিকৃত ইতিহাস পরিবেশন করেছেন।

মুহাম্মদ বিন কাসিমের পূর্বেও বহির্ভারতের মুসলমানদের ভারতে আসা যাওয়া অব্যাহত ছিল। দক্ষিণ ভারতের একটি অঞ্চলের নাম মালাবার বা মালবার। এই মালবার আরবদের জন্য একটি বিশেষ ব্যাবসা কেন্দ্রিক ঘাঁটি ছিল। মাদ্রাজের এক বন্দরের উপর দিয়ে আরবরা ব্যাবসা বাণিজ্যের জন্য চীন যাতায়াত করতেন। অবশ্য ব্যাবসা বাণিজ্যের সাথে সাথে সারা পৃথিবীতে ইসলাম পৌঁছে দেবার দায়িত্ববোধও তাঁদের ছিল। মালাবার স্থানটিকে আরবরা ‘মা’বার বলতেন, আরবিতে এর অর্থ পারঘাট। আরব বণিক, মুবাল্লিগ ও নাবিকেরা এই ঘাটের উপর দিয়ে মাদ্রাজ, মক্কা, হেজাজ, মিশর ও চীনের মধ্যে যাতায়াত করতেন। বলা বাহুল্য, ‘মা’বার নাম তাঁদেরই রাখা।

যাই হোক, আসল কথায় আসা যাক।মালাবার অঞ্চলে যে সমস্ত বিদেশি মুসলমানেরা ব্যাবসা অথবা ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন, তখনকার ভারতে বসবাসকারী ‘ভারতীয় জনগণ’ ইচ্ছা করলে ঐ মুষ্টিমেয় মুসলমানদের হত্যা করতে পারতেন অথবা পারতেন তাঁদের ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু ভারতীয়রা সে ব্যাবহারতো করেনই নি, বরং সাদরে আদর ও আপ্যায়ন দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন তাঁদেরকে। এ এক ঐতিহাসিক মহা ঔদার্য।

ঐ নবাগত মুসলমানদের ভয়ে ভীত বা সংকুচিত হয়ে ভারতীয়রা মৌন হয়ে গিয়েছিলেন এ কথা আদৌ সত্য নয়। ভারতের বিশাল জনসাধারণ শক্তি প্রয়োগ করলে ফুৎকারে উড়ে যেত ছোট্ট ঐ মুসলিম দলটি। আসলে মুসলমানদের রুপ, গুণ, জ্ঞান, গরিমা, সাহসিকতা ও নিয়মানুবর্তিতা এমনকি পোষাক পরিচ্ছদ পর্যন্ত ভারতীয়দের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন। তারা মুগ্ধ হয়েই তাঁদের দান করেছিলেন একটি সন্মানজনক উপাধি, ‘মোপলা’ ‘মহাপিলা’ বা মহাপুত্র।

ভারতীয়রা প্রথম দেখলেন মুসলমানদের দেহে সেলাই করা পোষাক। ভারতীয় জনসমাজে বেশভূষা ও পোষাক পরিচ্ছদে এই ইনকিলাব সৃষ্টি হলো মুসলমানদের শুভাগমনে। মুসলমানদের চালচলন, সততা ও সভ্যতায় আকর্ষিত হয়ে, সেইসঙ্গে অপরদিকে ব্রাক্ষণতন্ত্রের তথাকথিত ‘ছোটলোক’দের উপর অত্যাচারের রোলার চালানোর চাপে নিষ্পেষিত হয়ে যাঁরা বাঁচতে চাইছিলেন তাঁরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাঁদের বুক থেকে নামিয়ে ফেললেন নিষ্পেষনের রোলার।

আর মুসলমানেরা জনগণের সমর্থন, সাহায্য এবং নিজেদের যোগ্যতা ও ক্ষমতায় উন্নতি করতে করতে পৌঁছে গেলেন দিল্লির সিংহাসন পর্যন্ত। মুসলমানদের শাসন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঈশ্বরের আশীর্বাদ মনে করেছিলেন ভারতীয় জনগণ। তাই রাজপূতদের মতো সম্ভ্রান্ত বংশের নেতারাও স্বেচ্ছায় তাঁদের বাড়ির কন্যাদের সঙ্গে সম্রাট বাদশাহ, প্রিন্স, মন্ত্রী ও আমলাদের বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করে আত্মীয় হয়ে গিয়েছিলেন মুসলমানদের। এটা যদি তাদের মনের বিরুদ্ধে হতো তাহলে কন্যা প্রদানকারীরা মুসলমানদের অধীনে উজির, মন্ত্রী, সেনাপতি, আমলা, সুবেদার, মনসবদার, বা নবরত্নের রত্ন হওয়ার সুযোগকে দুর্যোগ মনে করে প্রত্যাখ্যান করতেন।

আর্য সভ্যতা ও আর্যদের ভারত আগমন মেনে নিলে এও মেনে নিতে হয় যে, আর্যরা গৃহপালিত পশুদের স্নেহ ও আদর দিতে জানতেন। কিন্তু কালো চামড়ার ভারতবাসীদের গলায় অনার্য, শূদ্র, ব্রাত্য, ছোটলোক, প্রভৃতি নানা উপাধির ফাঁস পরিয়ে দিয়েছিলেন তারা। আদি ভারতীয়দের মেয়েদেরকে বিবাহ করা আর্যদের পক্ষে সম্ভব ছিল না শুধু নয়, বরং তা ছিল কল্পনাতীত। এই ক্ষেত্রে বহির্ভারতের মুসলমানেরা ছিলেন ব্যাতিক্রম। ইসলাম ধর্ম থেকেই তাঁরা হয়েছিলেন এই উদারতার অংশীদার। তাই তাঁরা পেরেছিলেন বাজার থেকে ক্রীতদাসকে কিনে সেই অচেনা অজানা বংশপরিচয়হীনকে শিক্ষা দীক্ষায় পরিপুষ্ট ও উপযুক্ত করে নিজের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সিংহাসনে বসাতে। ইতিহাসের দাস বংশ তার স্বর্ণোজ্জ্বল উদাহরণ।

মুসলিম সমাজের উলামা, সাধক-তাপসদের ব্যাবহারে ভারতের হিন্দুরা এতো মুগ্ধ ও আকৃষ্ট হয়েছিলেন যে তাঁদের মৃত্যুর পরে আজও তাঁদের সমাধিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অব্যাহত। এটাও মুসলমান আলেম উলামাদের অতুলনীয় চরিত্র-ব্যাক্তিত্বের একটা জলজ্যান্ত প্রমাণ। মুসলমানদের ভারতে পদার্পণের প্রথম তারিখ থেকে আজকের তারিখ পর্যন্ত ছোট বড় শহর-গ্রামের মসজিদের দরজায় হিন্দু মহিলা ও শিশুদের ভীড় দেখা যায় যাঁরা নামাজী মুসলমানদের মুখের ফুঁ বা বাতাস নিতে চান তাঁদের গ্লাস বা বোতলের জলে এবং কচিকাঁচাদের মাথায় ও দেহে… ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের শ্রদ্ধা যোগ্য চরিত্রের এও এক তুলনাহীন নমুনা।

হিন্দুরা মুসলমানদের কাছ থেকে শুধু সেলাই করা পোষাক পরাই শেখে নি। মুসলমানদের মতো লম্বা আলখাল্লা পরা, মাথায় টুপি ও পাগড়ি ব্যাবহার করা, দাড়ি রাখা ইত্যাদি শুরু হয়েছিল ব্যাপকভাবে। রবীন্দ্রনাথ, উমেশচন্দ্র, সুরেন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, রামমোহনের পোষাক পরিচ্ছদ লক্ষ্য করার মতো। তারা মুসলমানদের অনুকরণেই যে এই ধরনের পোষাক পরিচ্ছদ পরিধান করতেন তা বলাই বাহুল্য।

আজ মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের যে সন্ত্রাস আসলে তা ইংরেজদের চক্রান্ত, ইংরেজ এবং তাদের মানসপুত্রেরা ইতিহাসে ভেজাল দিয়ে মুসলমানদেরকে বিপজ্জনক চরিত্রে চিহ্নিত করেছে। তত্ত্ব, তথ্য ও ইতিহাসের নামে কোটি কোটি মানুষের হাতে এমন বিকৃত মিথ্যা ইতিহাস পৌঁছেছে যার ফল স্বরূপ আগুনে পেট্রল ঢালার মতো সাম্প্রদায়িকতার গতি বেড়েই চলেছে।

[তথ্যসূত্রঃ- চেপে রাখা ইতিহাস, পৃঃ- 38-39;  এ এক অন্য ইতিহাস, পৃঃ- 281-282- 293 ; ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস; ভারতে ইসলাম, উইকিপিডিয়া।]

আরমিন খাতুন

1
আপনার মতামত

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
1 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
Rujina Begum Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Rujina Begum
Member
Rujina Begum

আলহামদুলিল্লাহ্,খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন।কিন্তু তবু একশ্রেণির প্রতিহিংসা পরায়নরা সবসময় ওরা কুরআন হাদিসের ভুল ধরার চেষ্টায় বদ্ধ পরিকর থাকে।স্বল্প জ্ঞান নিয়ে এরা কুরআন-হাদীসের দুই একটা আয়াত তুলে নিজেকে বিশাল ব‍্যাখ‍্যাকার মনে করেন। এরাই নাকি মানবধারী মেয়েদের নগ্নতাকে সাপোর্ট করে।