হিযাবের মাহাত্ম্য

হিযাবের মাহাত্ম্য

ভোরের আজান আর বসন্তের কোকিলের কুহুতান মিলে শিফার অন্তরে বাদ্য বেজে উঠল। ধড়ফড় করে উঠে পড়ে শিফা। তড়িঘড়ি অযু-নামায-কুরআন তিলাওয়াত সেরে ফেলে। এবার ইউনিভার্সিটি যাওয়ার জন্য সাজগোজে ব্যস্ত শিফা। সালোয়ার-কামিজ আর হিযাব ব্যবহারে অভ্যস্ত সে। বড় সংকটময় সময়। শতত দেখতে পায় অতি প্রগতির নামে অশালীন পোশাক পরিচ্ছদ। যা কেবল ইভটিজিং (যৌন সন্ত্রাস) কে উৎসাহিত করে। সে ভাবে সবার আরো শালীন ও সতর্ক হওয়া উচিত। একটু আগে পাঠ করা সূরা আল আহযাবের আয়াতটি তাকে বার বার সাবধান বানী শোনায়, যেখানে আল্লাহ তার প্রিয় নবী রাসূল(সঃ)কে বলছেন, “হে নবী তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মু’মিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে।” পোশাক শরীর ঢেকে রাখে। যা অশ্লীলতা ও ইভটিজিং প্রতিরোধ করে।  শিফা জানে এই তো বয়স। আল্লাহর বিধান মানতে হবে। পর্দা করা ফরয। ফরয তরক করলে আল্লাহ্ তায়ালা নারাজ হন। হিযাব ব্যবহার তো আলকুরআনের বিধান। সে হিযাব পরে নেয়। আলগা মাথায় বার হয়না। সে জানে হিযাব ছাড়া জ্বলন্ত আগুনের হাহাকার। অজস্র চেনা অচেনা চোখে ধর্ষিত হয় অনাবৃত শরীর। জাহান্নামের আহ্বান তার কানে বেজে ওঠে। হিযাবহীন মানুষকে সে দিবারাত্রি ডেকে চলেছে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাস্তা-ঘাটে চলমান ইভটিজিং (যৌন সন্ত্রাস) এর জীবন্ত দৃশ্য। পাতলা ওড়না আর আঁটোসাঁটো পোষাক তো ইভটিজিং এর খোরাক। তা হবে নাই বা কেন? নারীর সৌন্দর্যের বিকাশ, পুরুষের চোখ ও অন্তর তো জাগিয়ে তুলবেই। এই জাগ্রত অসংযমী অন্তরকে তো সবাই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয় না। বার হয়ে আসে ভিতরের পাশবিক হিংস্রতা, যা শার্দুলের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে…। ছিন্নভিন্ন নারী দেহ পড়ে থাকে ঝোপঝাড় অথবা প্রকাশ্য ফুটপাথে।

সুন্দর বেশভূষা পোষাকে ইউনিভার্সিটির পথে শিফা। নরম স্বভাব আর কপটতাহীন চরিত্রের অধিকারীনি সে। হিযাব পরে ইউনিভার্সিটির পথে পা বাড়ায়। চলার পথে বাস ও ট্রেনে বাঁকা চাহনির দৃষ্টিও পোহাতে হয় তাকে। এমন ইসলামিক বেশভূষা তো তার একারই। নাহ! সকলের বাঁকা চোখ তাঁর মনটাকে ভাঙতে পারে না। আর পাঁচ জনের মত হীনম্মন্যতার স্বীকার হয় না সে। শুধু বাহ্যিক পর্দা নয় তার অন্তরে জন্ম নিয়েছে তাক্বওয়ার পরিচ্ছেদ। সূরা আরাফের কয়েকটা শব্দ তাকে শক্তি জোগায়, যেখানে আল্লাহ বলছেন “আমি তোমাদেরকে পরিচ্ছেদ দিয়েছি এবং তাক্বওয়ার পরিচ্ছেদই সর্বোৎকৃষ্ট”। পবিত্র কুরআনের বাক্য গুলি তার মানসিকতা, চলার পথকে আরও উজ্জ্বল ও প্রসারিত করে।

পড়াশোনায়ও মন্দ নয় সে। ক্লাসে স্যারদেরও মন কেড়ে নেয় এই হিযাব পরা মেয়েটি। কো-এড শিক্ষা ব্যবস্থা তার মনের কোনে এক অজানা অস্বস্তিও দেয়। যেন কখনো পর্দার হুকুম অমান্য না হয় সর্বদা সতর্কিত সে। আল্লাহ ভীরুতা, সংযমী করে দেয় তার চাহনি ও গলার স্বরকে। চলাফেরাতেও ফুটে ওঠে ইসলামি আকিদাহ্।

তার কথাবার্তা, চলাফেরা, পোশাক-আশাক, পড়াশোনার ঢঙ ব্যতিক্রমী আকর্ষণীয়। যে কোনো মানুষের মনকাড়ার মতো চরিত্র। বি.টি রোডে বান্ধবীদের সাথে হাঁটছে শিফা। দশটা ত্রিশ মিনিটে পি.সি স্যারের ক্লাস। দ্রুত পা বাড়ায়। পিছন থেকে ভেসে এল শব্দ। শিফা……! তাকিয়ে দেখে অনেক পিছনে নিশাত। সে বলল – শিফা শোন , তোর জন্য আর.বি স্যারের নোট এনেছি।
শিফাঃ তাই! কই দেখি? ওহ্! এই নোট? এর চেয়ে ভালো নোট আমার আছে।
নিশাতঃ তাহলে নিবি না?
শিফাঃ না।
শিফা ইচ্ছা করেই এড়িয়ে যায়। শিফা জানে নিশাতের দুর্বলতা। নিশাত গান, কবিতা লেখায় ভালই পারদর্শী। শিফাকে নিয়ে স্বরচিত গান, কবিতা লেখে। অন্যকে কবিতা পাঠ করে শোনায় আর গান গেয়ে শোনায়। যখন ইউনিভার্সিটির ক্লাসরুমে থাকে তখন শিফাকে নির্দিষ্ট করে একটু নিকটে জায়গাটাও বেছে নেয়। তার অন্তর জুড়ে শিফার ছবি আঁকে।
সে এগিয়ে গিয়ে শিফার হাতে ধরিয়ে দিল বার্ষিক ম্যাগাজিন ‘উন্মেষ’ । পৃষ্ঠা খুলতেই শিফার চোখে পড়ল প্রথম কবিতাটি – “শিফার জন্য” – নিশাত। রাগে বিষ চাহনি চেয়ে পত্রিকাটি ফেরত দিল। বিতৃষ্ণা আর লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে আসে।
বি.টি রোডের পায়ে হাঁটা পথ। নানা ব্যঞ্জনাপূর্ণ কথায় পথ চলা। কিন্তু নিশাত চলে আর গান গায় শিফাকে কেন্দ্র করে –
“শিফা! শিফা!
তোমার চরনরেনু ,
আমার হৃদয় ধেনু ।
শিফা……..! “
দু-এক কলি গায় আর শিফার নাম জোড়ে। তালে তালে পা ফেলে চলল সবাই। নানা কথার গুঞ্জনের মাঝে নিশাতের গলার করুন সুর বাতাসে ভাসে। এ সুর বাতাসে বাঁশি বাজায়। কিন্তু শিফার হৃদয়ে বাজে না।
শিফা নিজেকে আব্রু দিয়ে ঢেকেছে। তাক্বওয়ার পর্দার মোড়কে মোড়া অন্তর অবৈধ প্রেমে সাড়া দিতে চায় না।
সে জানে ব্যাভিচারের অর্থ। শুধু শরীর নয়, হাত,পা,চোখ,অন্তর ও পারে ব্যাভিচারে শিকার হতে।
ইসলাম পবিত্র। পবিত্রতাই ইসলামের গুন। শিফার জানা আছে সংযমীতা কী? সংযমী না হলে যে জীবনের প্রতিটি সিঁড়িতে তার মূল্য দিতে হবে, স্বাভাবিক ভাবে তা শিফা ভালই জানত।
ক্লাস শেষ। চারটে বাজে। ইউনিভার্সিটির এক ফাঁকা রুমে আসরের নামাজ পড়ে স্টেশনের দিকে রওনা হয়।

শীতের কপোটতাহীন মনোরম পরিবেশ। জোৎস্নার হালকা আভায় ফেলা প্রতিটি পদক্ষেপ নিশাতের পিঞ্জর ভেঙে ফেলছে। কতক গুলি মস্তান বন্ধুদের নিয়ে শিফার অপেক্ষায় অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আর কল্পনার ডানায় উড়ছে নিশাত।

শিফা যখন প্ল্যাটফর্মে তখনও ট্রেন আসতে দেরী। সাথে বান্ধবী লিলি, সেও একই ট্রেন ধরবে।
নিশাত ধীর পায়ে এগিয়ে আসে কিন্তু শিফাকে সরাসরি ডাকতে সাহস পায় না।
‘লিলি!‘, নিশাতের কন্ঠস্বর।
লিলিঃ হ্যাঁ বল রে।
নিশাতঃ আর কত দিন অপেক্ষা করবো বল!? তুই ত জানিস আমি কতটা ভালোবাসি ওকে। আমি আর পারছি না। আজকে আমি এর শেষ দেখতে চাই।
লিলিঃ তুই যা বলতে চাস, শিফাকে সরাসরি বলতে পারিস।
কিছুক্ষণ চুপ থাকে সবাই। নীরবতা ভাঙে নিশাতের কন্ঠস্বর,“শোন শিফা,অনেকদিন ধরে তোকে বোঝাতে চেয়েছি বলতে চেয়েছি, কিন্তু তুই কখনই বুঝতে চাসনি।
‘কি বলতে চাস তুই?’ শান্ত অথচ দৃঢ় কন্ঠে প্রত্যুত্তর দেয় শিফা।
নিশাতঃ তোকে আমার ভালো লাগে।
শিফাঃ তোর মতো লম্পটের পাল্লায় পড়ে আমার জীবন নষ্ট করতে চাই না, আর তাছাড়া তোকে আমার ভালোও লাগেনা।
নিশাতঃ প্লিজ শিফা একবার ভাব আমার কথা, আমি তোকে কতটা ভালোবাসি…।
শিফাঃ কি ভাববো আমি! তোর মত লম্পট ছেলেকে ভলোবাসার কথা! ছিঃ! রাখ তোর ভালোবাসা, আমাকে আর বিরক্ত করিস না। আমার চোখের সামনে দিয়ে সরে যা।
রাগে রক্তিম হয়ে ওঠে নিশাতের চোখ। “লিলি তুই চলে যা এখান থেকে, আমি এর ব্যবস্থা করছি।” নিশাতের কন্ঠ প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠে। লিলিও ভয় পেয়ে যায়…।
“এই বাপ্পা,…,সুমন এদিকে আয়তো” ,মস্তান বন্ধুদেরকে ডেকে নেয় নিশাত।
“আমি যখন পেলাম না আর কাউকে পেতে দেবো না। ওকে নষ্ট করে শেষ করেদে তোরা।” শিফাকে লক্ষ্য করে মস্তান বন্ধুদের নির্দেশ দেয় নিশাত।
বাপ্পারা এগিয়ে গিয়ে থমকে দাড়ায় শিফার সামনে। কয়েক মুহূর্ত সবাই স্থির। ‘কি হলো?’ ঝাঁঝিয়ে ওঠে নিশাত। মস্তান বন্ধুরা মাথা নিচু করে থাকে। অনেক মেয়ের সাথে তারা অনেক ধরনের আচরণ করেছে কিন্তু কেউই শিফার মত নয়। এই ময়েকে দেখে অসংযমী অন্তর সংযমী হয়ে ওঠে। “তুই কাকে নষ্ট করতে বলছিস! এমন সুন্দর নিষ্পাপ মেয়েকে?” চেঁচিয়ে ওঠে সুমন। “আমরা তো কিছু করবোই না আর তোকেও কিছু করতে দেবোনা।যতক্ষণ না ট্রেন আসে, আমরা এখানেই থাকলাম একে তোর থেকে পাহারা দেওয়ার জন্য।”…..।
শিফার অন্তর থেকে অস্পষ্ট শব্দ বের হয়ে আসে, “আলহামদুলিল্লাহ”। 

 

সেরিনা বেগম

 

4
আপনার মতামত

avatar
3 Comment threads
1 Thread replies
2 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
2 Comment authors
Rujina BegumIron Mocker Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Iron Mocker
Guest
Iron Mocker

বাঃ! কি যুক্তি? কিছু পুরুষ মেয়েদের উত্যক্ত করবে বলে, আর মেয়েরা নিজেদের আচ্ছাদিত রাখবে । ঘরে বন্দী হয়ে থাকবে । নয়তো হিজাব পরে নিজেদের ঈমান ধরে রাখার ছলে,
তাই যদি হয় তাহলে পাঁচ বছরের শিশুরা ও ষাটোর্দ্ধ মেয়েরা রেপ হয় কেনো?
পাকিস্তানের মতন জায়গায় এতো ধর্ষন কেনো হয় মেয়েদের? ‌ওখানে তো মেয়েরা আচ্ছাদিত থাকে ।

Iron Mocker
Guest
Iron Mocker

উপরের গল্পটা পড়লেই বোঝা যাচ্ছে যে হিজাব পরা মেয়েটির প্রতি ছেলেটা আকৃষ্ট ছিলো । সেই ক্ষেত্রে এটা প্রমাণিত হয়ে যায় যে হিজাব পরলেও একটা মেয়ে যৌনহেনস্থার শিকার হতে পারে । অন্য ছেলেরা মেয়েটার সুরক্ষায় এগিয়ে এসেছিল মেয়েটা হিজাব পরেছিল বলে, এই যুক্তি অবান্তর । তাদের মধ্যে যদি বিবেকবোধ থাকে তাহলে যে কোনো মেয়ে হেনস্থার শিকার হলেই তারা এগিয়ে যাবে । সেই ক্ষেত্রে একটা মেয়ে মাথার চুল ঢেকেছে কি না ঢেকেছে, সেটা কোন‌ও ফ্যাক্টর হবে না, কারন তাদের বিবেক জাগ্রত হলে মেয়েটির পোষাক দ্বারা তারা বিচলিত হবে না । বরঞ্চ নিজেদের আত্মসংবরণ করবে । কোরান যারা প্রকৃতরূপে অধ্যয়ন করেছে, তারা মেয়েদের… Read more »

Rujina Begum
Member
Rujina Begum

এত সংকীর্ণ মনোভাব, প্রতিহিংসা পরায়ন ও ঈর্ষায় কাতর হয়ে ইসলামের মাহাত্ম্য লাভ করা যায় না ভাই। ইসলামের জ্ঞান অসীম ও চিরন্তন।এজন‍্যই ফ্রান্সের গবেষক ডঃ মরিস বুকাইলি তাঁর “Quran and Modern Science”গ্রন্থে তাঁর অকপটে স্বীকারোক্তি —“শুরুতেই ইসলামের প্রতি আস্থা নয়; বরং সত্যের সরল অনুসন্ধানই আমার পথ প্রদর্শন করে।আজও আমি এই পথটিই অনুসরন করে থাকি।তারপর কুরআন অধ‍্যয়ন ও গবেষণা শেষে আমার পূর্ণ বিশ্বাস জন্মেছে যে,কুরআন বাস্তবিকই পয়গম্বরের উপরে অবতীর্ণ এক মহান গ্রন্থ।”এই সত‍্যের আলোকে তিনি অত‍্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন –“মুহাম্মদ (সা.)এর যুগের কোন ও ব‍্যক্তির পক্ষেই সেই যুগে উপলব্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে এই সত্য লিপিবদ্ধ করা সম্ভব ছিল না।” ডঃ মরিস বুকাইলি আরও… Read more »