নারী তোমার জন্য

সব সুখ ভোগের পর আবার মনের কোণে উঁকি দেয় হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়ার বাসনা। নানা বাহানায় পেতে চায় তার মূল্যবান বিবেক প্রসূত সম্মানীয় সম্পদ। ঈমানী আয়নায় আপনার যথাযথ স্থান নির্ণয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফেলে আসা দিন গুলোর মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করে ফেলে। আশা আকাঙ্খার বাতি জ্বালিয়ে দেয় তাওবাহের রুমালে চোখ মুছে। নতুন দিগন্তের ফিকে আলোয় নিজেকে গুছিয়ে নিতে চায় অবশিষ্ট অঙ্কের কিনারায়। আজকের নারী আবার তার শ্রেষ্ঠ আসন খুঁজে পেতে যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

কয়জন বা ভেবে নিতে পারে জীবন- মরণ, ইহকাল-পরকালের সাজানো বাগানের মালি হওয়ার? যার হৃদয়ে আছে সেই মহান সত্বার প্রতি ভয়-আশা মেশানো বিনি সুতার বাসনা। সব সবই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ভোগের জন্য এই ধরণীর নিয়ামতকে কতগুলো সূত্র গেথে দিয়েছেন যা চিরন্তন সত্য রূপে মান্য করে জীবন অতিবাহিত করার কথা বলেছেন।

*কুরআনের বাণী ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর
হাদীস থেকে বুঝা যায়- ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, বিশ্ব বিষয়ক, ইহকালীন ও পরকালীন প্রয়োজনে পুরুষদের মতো নারীদেরও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, রাজনৈতিক, কবি, সাহিত্যিক, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ইত্যাদি হওয়ার অবকাশ আছে।

আপন ঘর থেকেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জ্ঞান চর্চা শুরু করেন। উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদিজা (রা) সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত পরিবারের সন্তান ছিলেন। এজন্যই তো জ্ঞান জগতের চিরন্তনী শ্রেষ্ঠ বানী ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনও উপাস্য নেই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল।’-এই কালিমা খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহা জেনে-বুঝেই বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন।
তিনি ছিলেন আল্লাহর অনুগত, স্বামীর সেবক এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় নিজের যাবতীয় ধন-সম্পদ বিতরণকারী একজন আদর্শ নারী।
তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্যে জ্ঞানের আলোয় এতই জ্বলেছিলেন যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সালামের জবাব সাবলীল ভঙ্গিতে দিতে পেরেছিলেন।

*উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা লেখা-পড়া দুইই জানতেন ।২২১০টি হাদীসের বর্ণনাকারী তিনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছেই কুরআন ও সুন্নাহর সার্বিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার থেকেই জ্ঞানের ঝর্ণাধারা বিশ্বব্যাপী প্লাবিত হয়। মধ্যযুগের বর্বরতার নিকষ কালো ঘনীভূত দিন সরে গিয়ে মানব জীবনে ফিরে আসে সোনালী দিনের সোনালী মুখ।

*আজ সমাজের বিভৎসতার কারাগারে আবদ্ধ হয়ে মানুষ দিশেহারা। সকলেই যদি কুরআনের আইন মেনে জীবনকে তরান্বিত করতে উৎসাহিত হয় তবে এই কালো দিন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশায় শ্রান্তির ঘুম ঘুমাতে পারত। জীবনে শান্তির পায়রা উড়াতে , যাবতীয় সূত্র একমাত্র কুরআনের আলোকে আলোকিত আছে চিরন্তন রূপে। তার আলোয় আলোকিত এ বিশ্ব জাহান। এই পবিত্র কুরআন পাঠ করা, বুঝতে পারা আর জীবনের মানে তাকে সমৃদ্ধি করার জন্য সচেষ্ট থাকা বিবেকবান মানুষের কজ। এজন্য সকল উম্মাহর একান্ত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এ কেবল মুসলমানের ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, সকল মানুষের জন্য শান্তির আলো।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন-
“তুমি বলো: আমার প্রতিপালকের কথা লিপিবদ্ধ করবার জন্য সমুদ্র যদি কালি হয়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা শেষ হবার পূর্বেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যাবে সাহায্যার্থে যদিও এর মতো আরেকটা সমুদ্র আনায়ন করি।)
(আল-কুরআন, সূরা কাহফ-১৮:১০৯

*জীবনের বাঁকে বাঁকে সবুজ ডানায় ভর করে চলতে আশ্রয় নিতে হবে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত শত শত আয়াতের ব্যাখ্যা। অনুধাবন ও অনুভূতির ছোঁয়ায় সাজিয়ে তুলতে হবে জীবনের প্রান্তর।
আজকের দিনে মানুষের অসহায়তার ধূসর বর্ণ চোখ যেন আরও ধূসর বর্ণ ধারণ করছে। মানুষের মূল্য বোধ হারিয়ে গেছে। মানুষ কুরআন ও সুন্নাহর ওয়াল থেকে অনেক অনেক দূরে অবস্থান করছে। আর ইসলামের বিকৃত রূপ, আর অপব্যাখ্যা করে জীবন কলুষিত করে ফেলছে।

যাক কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে, জীবনের গল্পে যেন উতরাতে পারি সেই প্রয়াসে আমরা প্রতিটি মা-বোন এগিয়ে আসি। নিজের মনগড়া ইসলাম নয়। সেখানে থাকবে কুরআন হাদীস এর আলো আর একনিষ্ঠতা। ইসলামের প্রতি আত্মপ্রত্যয় আর আত্মবিশ্বাসই সমাজের মূ্ল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
খুন,যখম, ধর্ষণে ভরে গেছে দেশ। ফাঁসির শ্লোগান দিকে দিকে। নির্মূলের কোনও উপায় নেই। সবাই দিশেহারা! তাহলে কোন উপায়ে সোনালী সময় ফিরবে আমাদের?

রাজা, প্রজা, আমলা, মিডিয়া সবাইয়ের মধ্যে কারাপসনের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে আছে। উলঙ্গ রাজার দেশে সবাই গা ভাসিয়ে চলছে। “রাজা তোর কাপড় কোথায় কে বলবে?”
শান্তির আবাস ভূমি ভেঙে গেছে।
নাটোরের বনলতা সেন বিদায় নিয়েছে।
হাজার বছর ধরে আর কোনও প্রেমিক বনলতার জন্য পথ অতিক্রম করে না!
এখন শুধু হিংস্র বর্বর শাপদেরা দিনের আলোয় ঘুরে বেড়ায়, আঁধারে নিমজ্জিত করার জন্য। খুবলে খায় জীবন্ত দেহ।

*তাই নিষ্ঠার সাথে কুরআন আর হাদীসের আলোকে আমাদের জীবনের কোনে কোনে সুতিমালা গেথে যদি সমবেত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারি তবে নারীর অধিকার ও কর্তব্য কর্মে মর্যাদা ফিরে পাওয়ার সফল স্বপ্ন দেখতে পারি।
অনেক অনেক তথ্য ভরে আছে কুরআন আর হাদীসের লিপিমালায় । সেগুলো নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তবেই আশার বীজ বপন হবে, আলোর বিকিরণ ঘটবে।

কয়েকটি আলো আমাদের জীবনে নিষ্ঠার সাথে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালাই-আমরা নারী পুরুষ উভয়েই আমাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখি আর পোশাক পরিচ্ছদের শালিনতা বজায় রাখি। কথার মধ্যে শালিনতা বজায় রাখি আর অশ্লীল, অপ্রীতিকর ছবি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। মাদক দ্রব্যের ভয়াবহ আবহ থেকে দেশকে মুক্ত করার প্রয়াস চালিয়ে যাই। ইসলামের মণিকোঠায় এগুলোর ভয়াবহ অনিষ্টের কথা বার বার উল্লেখ করে সচেতনতার শুভ সূচী তৈরি করা আছে ১৪০০বছর পূর্ব হতে পবিত্র কুরআনে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-
“হে বনী আদম! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবার ও বেশভূষার জন্য আমি তোমাদেরকে পরিচ্ছদ দিয়েছি এবং তাকওয়ার পরিচ্ছদ, এটিই সর্বোৎকৃষ্ট।”
(আল-কুরআন, আলআ’রাফ-৭:২৬)
হিযাবের হিমেল হাওয়ায় জীবনে শান্তির ফ্রেমে প্রেমের আদল বানিয়ে প্রভুর ভয়ে নিজেকে আত্মসংমীতার আবাস বানানোই হল স্বস্তির পৃথিবী। ইসলামী পোশাক আর ইসলামী মনন দুইই প্রয়োজন। না হলে নেগেটিভ আর পজেজেটিভে বিভৎস পরিবেশের অস্থিরতার ক্ষরণ ঘটবে। সমাজের অন্তর তথা মানুষের অন্তরের সজ্জা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাবে। যা আজকের দিনে ঘটে চলেছে।

*পবিত্র কুরআনে হিজাব করার নির্দেশ আসে পুরুষদের জন্য। পরে নারীর জন্য পর্দার আয়াত নাযিল হয়।
সূরা নূর এর ৩০নাম্বার আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-
“মুউমিন পুরুষদের বলুন তারা যেন দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জা স্থানের হিফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে।”
(আল-কুরআন, সূরা-নূর ,২৪:৩০)

সতীত্ব রক্ষা করা ও হরণ করা নারী পুরুষ উভয়ের প্রচেষ্টার সফল প্রয়াস। মানুষের বিবেকবুদ্ধি যখন নিষ্কলুষ পরিকাঠামো গঠনের পরিকল্পনায় নিয়োজিত করতে প্রয়াস চালাবে তখনই মানবতার কল্যাণের শীতলতা ছেয়ে যাবে।
তাই আজ শুধু লিখে বা বলে মানুষ গড়ার কারখানা বানানো যাবে না। নিজেদের জীবনে তা প্রতিষ্ঠিত করে ইসলামের আলোর বন্যা প্লাবিত করার প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। পুরুষ নারীর মর্যাদা দিক, তার ঘরের কাজে সাহায্য সহযোগিতা করুক,তার উপার্জনের কিছু অংশ স্ত্রীকে সোহাগের আদলে হাত খরচের জন্য তুলে দিক। স্ত্রীরা চলুক তাদের স্বামীদের হৃদয়ের মণিকোঠায়, চক্ষুশীতলের আরাম কিনারায়।

(প্রকাশিতব্য বই
‘চরিত্র গঠনে ইসলাম’
থেকে নেয়া)

আপনার মতামত

avatar
  Subscribe  
Notify of