দুআর আকর

দুআর আকর

পরিবর্তনশীল এই পৃথিবীতে অনেক কিছুর মতো আছে সমাজ, সংসার ৷ চোখের সামনেই সমাজের বুকে ঘটে চলেছে অজস্র ঘটনা ৷ সব ঘটনা তো আর দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকে না ৷ এরকম কত ঘটনারই আমরা সাক্ষী হতে পারি না । সদা পরিবর্তনের আবহে এমন অজস্র ঘটনার আমাদের দৃষ্টির আড়ালে ঘটে যায় বলে এমন মনে করার কারণ নেই যে সে পরিবর্তনের প্রভাব নিষ্ক্রীয় হয়ে থাকবে । ভালো-মন্দের আমল যেখানে লেখা হয় সেখানে লেখা থাকে, রক্ষিত থাকে । সে সবই যতদিন মানুষের অগোচরে থেকে যায়, ততদিন আমাদের বিবেচ্য নয় ৷ তবে যদি জেনে যায় তার সুন্দর অন্ত:করণ কিংবা কদাকার মনের প্রতিরূপ, তাহলে তাকে বিবেচনায় নেওয়া জ্ঞানের পরিচায়ক হবে ।

এমনি কিছু কথা দিয়ে গড়া এ বিনা চরিত্রের গল্প । হ্যাঁ, গল্প তো গল্পই। তা মহিম,রহিম, সোহাম যে কেউ গল্পের নায়ক হয়ে উঠে । রাবেয়া, বুশরা, রজিনা নিজেকে গল্পের নায়িকা ভাবতে পারে । এ একটা আয়না মাত্র । যে যার মতো মুখ দেখে নেয় । নিজেকে খুঁজে পায় আনন্দ-বেদনায় ।

মানুষের বল,বুদ্ধি, ভরসা সব আছে তবে একা কোনও
কাজ সম্পূর্ণ করতে পারে না।খানিকটা করে, বা সবটাই ৷ ছোঁয়া থাকে শুধু
জ্ঞানী-বুদ্ধিমান মানুষের । সাহায্যের জন্যও
হাত বাড়িয়ে রেখেছেন কিছু জ্ঞানী মানুষ । এঁরা সমাজের
বিজ্ঞ,পণ্ডিত, আলিম,হাফিজ । পথের সন্ধানে মানুষ এঁদের
কাছে ছুটে যায় । ইলমের ভারে জ্ঞানের সম্ভারে ভরে থাকে আলিমের ভাণ্ডার ।সান্নিধ্য লাভের জন্য মানুষ আকুল । ইলম তো প্রদীপ স্বরূপ। প্রদীপের আলো যখন কমে আসে তখন আলিমের জ্ঞানের আলোয় প্রদীপ আবার উজ্জ্বল শিখায় জ্বলে উঠে। এজন্য তো ‘আল-উলামাউ ওয়াছাতুল আম্বিয়া’ (আলেমরা নবির উত্তরাধিকার— হাদিস)৷
এমন অনেক বিশিষ্ট বিদ্বান ব্যক্তি আছেন যাদের নামে শিশু থেকে বয়স্করা সকলেই কুর্ণিশ করে । তাঁদের কথাতে আর লেখাতে মানুষ মনের খোরাক পায় । যাদের লেখা পড়ার জন্য মানুষ অপেক্ষা করে । ঈমানদার মানুষেরা পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করতে প্রতীক্ষা করে তাঁদের জন্য।

অল্পসময়ে তাঁদের প্রতি মানুষের যে শ্রদ্ধা, ভক্তি ভালবাসা জমে ওঠে তা মূলত তার জ্ঞান ও বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রভাবে ৷ কারণ মানুষ অদৃশ্য সম্পর্কে বেখবর । অনেক সময় অন্ধ ভক্তিও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় লক্ষ্য করা যায় । সমাদর আর কদরে আলিমদের হৃদয় আপ্লুত হয় । মনের মধ্যে প্রগলভতায় ভরে যায়। যখন তাদের ইলম ও সততা সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বাস্তবতাকে অতিক্রম করে, তখন তার সত্যতার রূপ দিতে কপটতার আশ্রয় নিতে থাকে কিছু নামধারী আলিম । ধীরে ধীরে অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় দূর হতে থাকে । পার্থিব সম্মান আর অহঙ্কার আলিমকে গ্রাস করে । লোকচক্ষুর আড়ালে কুকর্মে লিপ্ত হয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদের হৃদয়ের নূরকে হয়তো ছিনিয়ে নেন । আলিম গুমরাহীর কবলে পড়ে ।শয়তানী আচরণ তার মজ্জাগত হয়ে যায় । একে একে নামায,কুরআন তিলাওয়াত,আখলাক, আমল বিদায় নেয়। পড়ে থাকে কেবল বচনের দৌরাত্ম্য ।বচনের আঘাতে মানুষ অতিষ্ঠ। ভক্তির সূত্র ধরে নারী ভক্তদের কানে সুকথার নামে কুমন্ত্রণা যোগাতে থাকে।ভালো কাজের নামে জাহান্নামের পথে পরিচালিত করে। ভালো মানুষের রূপ নিয়ে প্রবেশ ঘটে তাদের খাসমহলে । পর পর আইনের বেড়া ভাঙতে থাকে। ইলমের যোগ্যতায় বাড়ে ভক্তের সংখ্যা ৷ শহর, শহরতলি , প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে যায় তাদের দীর্ঘ কালো হাত ৷ আসলে তারা ভুলে যায় আল্লাহর বাণী— انما يخشي الله من عباده العلماء তবে এধরণে মানুষ সংখ্যায় নিতান্তই তুচ্ছ ৷

মিথ্যাকে বার বার সত্য বলে জানালে একদিন মানুষ মিথ্যাটাকে সত্য মনে করে। এর ক্ষেত্রে যেটা ঘটে তা হলো একটা পাপ বার বার করলে পাপের অনুভূতি ধ্বংস হতে থাকে ।
নারী চোখকে ফাঁকি দেওয়া বড়ো কঠিন নয় । যৌন চাহিদা সম্পন্ন নারী বা পুরুষ অপ্রয়োজনে ও অতিরিক্ত আলাপ ব্যভিচারের দিকেই পদক্ষেপ করা ৷ হিটলারের তথ্য মন্ত্রী গোয়েবলসের মতো মিথ্যাকে সত্য বলতে তারা বার বার মিথ্যা জিনিসের কুমন্ত্রণা প্রয়োগ করেন। মনের আনন্দে কাজ চালিয়ে যান।কলমও চলে।

কিন্তু তার অলক্ষ্যে যিনি হিসাব লেখেন তাঁর খাতায় ভরে যায় আলিমের আমলহীন ও মন্দ আমলের অসংখ্য পৃষ্ঠা।

তাদের থেকে বিদায় নেয় কুরআনের নূর । মুছে যায় হাদিসের সত্য বাণীর সততাপূর্ণ আচরণ। সেখানে আশ্রয় পায় কপটতা।

মানুষ জেনেছে তাদের কপটতার খোলস। ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে ।
অনেক ভক্তের চোখ খুলে গেছে। দেখেছে এ পথ তো কাবার পথ নয় । এ যেন পঙ্কিলতা পূর্ণ জাগতিক বিনোদনের দিকে ডেকে নেওয়ার শঠতাপূর্ণ কৌশল ৷

ভক্তের ভক্তির অশ্রুজলে হয়তো রক্ত ভেসে যায়। চোখের মাঝে একরাশ
গ্লানির নোনাজল প্রবাহিত হয়। নিদ্রা ছেড়ে বিসর্জন দিয়ে কেঁদে যায় । ঈমানের বলে দু’আ করে—
আল্লাহ! কপটতা থেকে মানুষকে রক্ষা করো।

“মুনাফিক (অর্থাৎ কপট)নর-নারী……….আল্লাহ্ ওদের
অভিসম্পাত করেছেন এবং ওদের জন্য আছে চিরস্থায়ী
শাস্তি ।”
( আলকুরআন ,দশ:সাতষট্টি -আটষট্টি )

“মানুষের মন ও মুখ সমান না হওয়া পর্যন্ত সে মু’মিন হয়
না।”(আলহাদিস-সগীর)

“এ যুগের বন্ধুত্বে আছে কপটতা। প্রত্যেকের বাইরের দিকটা সুন্দর । কিন্তু ভিতরটা বড় বিশ্রী।এমনকি জ্ঞানীদের অন্তর ও কলুষিত ।”
হযরত মালিক ইবনে দীনার (রহ:)

‌ – দুই-
মুমিনের দু’আর বরকতে দুকুল প্লাবিত হয়ে যায়। ঈমানী মন আনন্দ সাগরে ভাসে। ইসলামের আঙিনায় রবের করুণায় অনুতাপের অশ্রুতে ধূসর পৃথিবী সিক্ত হয়। কঠিন জমিন নরম হয়ে ওঠে। কন্টকাকীর্ণ পথ সুগম হয়। পথের পাথেয় থাকে একটুকরো
ঈমানে। এই ঈমানকে সযত্নে টিকিয়ে রাখতে প্রহরীর রাত কাটাতে
থাকে মুমিন । কারণ—
ব‍্যভিচার করলে ঈমান থাকে না,
চুরি করলে ঈমান থাকে না,
দস্যুবৃত্তি করলে ঈমান থাকে না,
পরনিন্দা করলে ঈমান থাকে না,
অতএব এগুলো সম্পর্কে সাবধান হওয়া আবশ্যক।
(হাদীস : বুখারী)
সাবধানতার ডানায় ভর করে প্রবাহমান নদীর চর ছুঁয়ে উড়তে থাকে সীমান্তরেখার রঙ মেখে। নিরুদ্দেশ যাত্রায় পাড়ি জমায়।

জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করতে পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে পথ চলতে থাকে। বহমান জীবন স্রোতোস্বিনী নদীর মত। প্রতিনিয়ত ঘটনার জোয়ার ভাটা খেলে যায় বুকের উপর দিয়ে। পুঞ্জীভূত বেদনাগুলো
মোহনায় মিলিয়ে যায়। অশ্রু নীর নীরবে নিভৃতে মন্দাকিনী তালে
যিকিরের তানে বয়ে যায়। লোনা জল মিষ্টিতে পরিণত হয়। অঙ্কুরিত বীজ সোনালী ফসলের বাগান বুনে। দয়া,মায়া, মমতা,দান, সদকা,হজ্ব, যাকাত,সলাত,ফুরকনের ফসলে ভরে উঠে আঙিনায়। ত্রুটিমুক্ত জীবনে জ‍্যোৎস্না রাতের ঝর্ণার প্লাবনের ধারা বয়ে যায়। সব দোষ স্খলন ঘটে। পাপরাশি শুকনো পাতা হয়ে ঝরে যায়। ইসলামী মূল্যবোধ ফিরে আসে ভাঙাচোরা জীবনে।
পৃথিবীর ধূসর পথে খাতা কলমের যোগাযোগ হয়। মিলে অমিলের
হিসাবের পৃষ্ঠাগুলো মিলিয়ে নিতে দেরি হয় না তাঁদের । গন্ডদেশে
বয়ে যায় তাওবার রুমালে ভেজা নীলাশ্রু। ইসলামের দুয়ারে মানবতার মুক্তি ফিরে ফিরে আসে। চোখের রেটিনা ভুলের চোরাবালি মুছে ফেলে।
এমনভাবে হঠাৎ ধূসর জীবনের রঙ বদলায়। তাঁরা পাপের রাজ‍্য
হতে মুক্তি পেতে বদ্ধপরিকর হয়। আল্লাহর নেক রহমতের পুষ্প বৃষ্টি ঝরে পড়ে তাঁদের উপর।
পুঞ্জীভূত মিথ্যার জালের বুনন একদিন ছিঁড়ে পড়ে। নেটওয়ার্কে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে একঝাঁক অবৈধ প্রণয়ীর বোবা চিত্র। বজ্র আঁটুনির ফস্কা গিরো সেদিন খুলে যায়। অবৈধ লুকোচুরির চৌর্যবৃত্তি উন্মোচিত হয়ে পড়ে। সর্বসমক্ষে তাদের লজ্জার মাথা নিমজ্জিত হয়।কুকামনা হতে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা করতে তারা
বাধ‍্য হন।। ধূসর পৃথিবী তখন দারুচিনি দ্বীপের স্বপ্ন দেখতে থাকে।

“সত‍্য এসে গেছে এবং মিথ্যা অপসৃত হয়েছে,আর মিথ্যা তো অপসৃত হওয়ারই ছিল।”
( আল-কুরআন: ১৭:৮১)
জীবনের পাতায় তখন সত‍্যের দিনলিপি আশ্রয় নিতে থাকে।। মিথ্যার জটেরা কালবৈশাখীর কালো ঝড়ে উড়ে যায়।
নব কিশলয়ে ছেয়ে যায়আষাঢ়ের প্রথম দিবস। গোলাপের সুরভী ভরে যায় ছন্দময় জীবনের প্রতিটি ক্ষণ।
একদিনের কালবৈশাখীর ঝড়ের তান্ডব সমস্ত কলুষতাকে মুছে
দিয়ে গেছে। মন্দের বিষবৃক্ষ জীবনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। দিয়ে গেছে নতুন বার্তা। ধূসর আকাশ নৈতিকতার জাল বুনে যায়।
তাঁরা মুক্ত বাতাসে বিহার করেন। ভাগ‍্যবানেদের হৃদয়াকাশে
কুরআনের আলো জ্বলে উঠে:
“ভালো ও মন্দ সমকক্ষ নয়। যা কিছু সর্বোত্তম তা দিয়ে মন্দকে
মোকাবেলা করো। এর ফলে তোমাদের শত্রুগণ তোমাদের ঘনিষ্ঠ
বন্ধু হয়ে যাবে।”(আল-কুরআন:৪১:৩৪)

তাঁরা আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে চলেন। পারলৌকিক পাথেয় সংগ্রহে লিপ্ত হন। তাঁদের হৃদয়াকাশে জমে থাকা আলো পুণরায় উদ্ভাসিত হয়:
“….. তোমরা যে সৎকাজ কর, আল্লাহ তায়ালা জানেন, এবং তোমরা পারলৌকিক পাথেয় সংগ্রহ কর, এবং আত্ম-সংযমই শ্রেষ্ঠ
পাথেয়….।”
(আল-কুরআন:২:১৯৭)

– সেরিনা বেগম

আপনার মতামত

avatar
  Subscribe  
Notify of